নতুনদের জন্য যোগব্যায়াম: কীভাবে শুরু করবেন, সহজ আসন ও টিপস
যোগব্যায়ামে নতুন? কীভাবে শুরু করবেন জানুন: সহজ আসন, ১৫ মিনিটের সহজ রুটিন, কী কী লাগবে, নিরাপত্তার টিপস এবং কত ঘন ঘন অনুশীলন করবেন।
এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য এবং পেশাদার চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার স্বাস্থ্য নিয়ে সবসময় ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
নতুন হিসেবে যোগব্যায়াম শুরু করতে হঠ যোগের মতো কোমল একটি ধরন বেছে নিন, সপ্তাহে দুই-তিনবার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট অনুশীলন করুন, এবং একজন যোগ্য প্রশিক্ষকের কাছে বা নতুনদের ক্লাসে কয়েকটি মৌলিক আসন শিখে নিন। ধীরে নড়াচড়া করুন, শ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন, আর কখনো ব্যথা সহ্য করে জোর খাটাবেন না।
যোগব্যায়াম শারীরিক আসন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শিথিলতাকে একসঙ্গে মেলায়। শুরু করতে নমনীয়, ফিট বা কমবয়সী হওয়ার দরকার নেই। নিরাপদে শুরু করতে যা যা জানা দরকার তার সবই এই গাইডে আছে।
যোগব্যায়াম কী?
যোগব্যায়াম হলো মন ও শরীরের একটি অনুশীলন, যার শুরু প্রাচীন ভারতে। আধুনিক বেশিরভাগ ক্লাসে তিনটি উপাদান থাকে:
- আসন, যা শক্তি, নমনীয়তা ও ভারসাম্য বাড়ায়
- শ্বাসের কৌশল (প্রাণায়াম), যা শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করে
- ধ্যান বা শিথিলায়ন, প্রায়ই সেশনের শেষে
মায়ো ক্লিনিক যোগব্যায়ামকে এক ধরনের "চলমান ধ্যান" বলে বর্ণনা করেছে। ধীর ও স্থির শ্বাস শরীরকে শান্ত অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যা হৃৎস্পন্দন কমাতে ও আপনাকে রিল্যাক্স হতে সাহায্য করতে পারে।
যোগব্যায়ামের উপকারিতা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (NCCIH) অনুযায়ী, গবেষণা বলছে যোগব্যায়াম সাহায্য করতে পারে:
- কোমরের নিচের অংশের ব্যথা কমাতে, যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে
- মানসিক চাপ সামলাতে
- ঘুমের মান উন্নত করতে
- মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যে
- ভারসাম্য বাড়াতে, যা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে
যোগব্যায়াম মেরুদণ্ডকে নানা দিকে নড়ায়, যা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার আড়ষ্টতায় সাহায্য করতে পারে। মানসিক চাপ যদি আপনার জীবনের বড় অংশ হয়, তাহলে আমাদের গাইড মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানোর উপায়-ও দেখুন।
নতুনদের উপযোগী যোগের ধরন
সব যোগব্যায়াম একরকম নয়। কিছু ধরন ধীর ও কোমল, আবার কিছু দ্রুত ও ঘাম ঝরানো।
| ধরন | গতি | নতুনদের জন্য ভালো? |
|---|---|---|
| হঠ যোগ | ধীর, মৌলিক আসন | হ্যাঁ, শুরুর জন্য দারুণ |
| ইন যোগ | খুব ধীর, দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা | হ্যাঁ, নমনীয়তা ও প্রশান্তির জন্য |
| রেস্টোরেটিভ | কোমল, সরঞ্জামের সাপোর্টে | হ্যাঁ, শিথিলতা ও সেরে ওঠার জন্য |
| বিন্যাসা | প্রবাহমান, মাঝারি থেকে দ্রুত | মৌলিক বিষয় শেখার পর |
| অষ্টাঙ্গ | দ্রুত, নির্দিষ্ট ক্রম | অভিজ্ঞদের জন্য ভালো |
| হট যোগ | গরম ঘরে করা হয় | শুরুতে আদর্শ নয় |
শুরু করতে যা যা লাগবে
খুব সামান্য কিছু লাগে:
- একটি যোগা ম্যাট, যা পিছলে যায় না
- আরামদায়ক পোশাক, যাতে নড়াচড়া ও স্ট্রেচ করা যায়
- ঐচ্ছিক সরঞ্জাম, যেমন একটি ব্লক, স্ট্র্যাপ বা শক্ত কুশন। একটি বই বা তোয়ালেও চলবে।
- একটি শান্ত জায়গা, যেখানে হাত-পা ছড়ানোর মতো যথেষ্ট জায়গা আছে
খালি পায়ে অনুশীলন করুন। অনুশীলনের দুই-তিন ঘণ্টা আগে ভারী খাবার না খাওয়ার চেষ্টা করুন।
নতুনদের জন্য ৮টি সহজ যোগাসন
শুরুতে প্রতিটি আসনে ৩ থেকে ৫টি ধীর শ্বাস পর্যন্ত থাকুন। সময়ের সঙ্গে আরও বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন।
- তাড়াসন (মাউন্টেন পোজ)। পা কোমরের সমান দূরত্বে রেখে, হাত দুই পাশে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। শরীরের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দিন এবং মেরুদণ্ড লম্বা করুন।
- বালাসন (চাইল্ড'স পোজ)। হাঁটু গেড়ে বসে গোড়ালির দিকে পিছিয়ে বসুন, তারপর হাত সামনে ছড়িয়ে বা দুই পাশে রেখে সামনে ঝুঁকে পড়ুন। যখনই বিশ্রাম দরকার, এই আসনে ফিরুন।
- মার্জারি-বিটিলাসন (ক্যাট-কাউ)। হাত ও হাঁটুতে ভর দিয়ে আলতো করে পিঠ উপরে গোল করুন (বিড়াল), তারপর পেট নিচে নামিয়ে বুক তুলুন (গরু)। শ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নড়ুন।
- অধোমুখ শ্বানাসন (ডাউনওয়ার্ড-ফেসিং ডগ)। হাত ও হাঁটুতে ভর দেওয়া অবস্থা থেকে নিতম্ব উপরে ও পেছনে তুলে উল্টো "V" আকার তৈরি করুন। পায়ের পেছনের পেশি টানটান লাগলে হাঁটু ভাঁজ রাখুন।
- লো লাঞ্জ (অঞ্জনেয়াসন)। এক পা সামনে দুই হাতের মাঝে আনুন এবং পেছনের হাঁটু ম্যাটে নামান। পেছনের দিকের নিতম্বের সামনের অংশে টান অনুভব করুন।
- বীরভদ্রাসন ২ (ওয়ারিয়র II)। পা চওড়া করে দাঁড়ান, সামনের পায়ের আঙুল সামনের দিকে, পেছনের পা বাইরের দিকে ঘোরানো। সামনের হাঁটু গোড়ালির ঠিক উপরে ভাঁজ করুন এবং দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিন।
- বৃক্ষাসন (ট্রি পোজ)। এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পা গোড়ালি বা পায়ের ডিমে রাখুন, কখনোই হাঁটুর উপর নয়। ভারসাম্যের জন্য দরকার হলে দেয়াল ধরুন।
- শবাসন (কর্পস পোজ)। হাত-পা শিথিল করে চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন। কয়েক মিনিট ধীরে শ্বাস নিন।
নতুনদের জন্য ১৫ মিনিটের সহজ রুটিন
সপ্তাহে দুই-তিনবার এই রুটিনটি করে দেখুন:
- আরাম করে বসে ১ মিনিট ধীরে শ্বাস নিন।
- ১ মিনিট মার্জারি-বিটিলাসন (ক্যাট-কাউ)।
- ১ মিনিট বালাসন।
- ৩০ সেকেন্ড অধোমুখ শ্বানাসন, তারপর বিশ্রাম। দুবার করুন।
- লো লাঞ্জ, প্রতি পাশে ৩০ সেকেন্ড।
- বীরভদ্রাসন ২, প্রতি পাশে ৩০ সেকেন্ড।
- বৃক্ষাসন, প্রতি পাশে ৩০ সেকেন্ড।
- ১ মিনিট বালাসন।
- ৩ থেকে ৫ মিনিট শবাসন।
একটি পরিপূর্ণ রুটিনের জন্য সপ্তাহে যোগব্যায়ামের সঙ্গে অন্য কার্যকলাপ মেলান, যেমন হাঁটা বা যন্ত্র ছাড়া ঘরে ব্যায়াম।
নিরাপত্তার টিপস
সুস্থ মানুষের জন্য যোগব্যায়াম সাধারণত নিরাপদ, তবে চোট লাগতে পারে। এই টিপসগুলো মনে রাখুন:
- যোগ্য প্রশিক্ষকের কাছে শিখুন। NCCIH বলছে, কোনো নির্দেশনা ছাড়া একা অনুশীলন করা চোটের বেশি ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। আপনার কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে প্রশিক্ষককে জানান।
- কখনো ব্যথা সহ্য করে জোর খাটাবেন না। হালকা টান ঠিক আছে। তীক্ষ্ণ বা চিমটি কাটার মতো ব্যথা মানে থামুন।
- যে আসন ঠিক লাগছে না তা বাদ দিন। ক্লাসের প্রতিটি আসনই করতে হবে এমন নয়।
- সরঞ্জাম ব্যবহার করুন। ব্লক ও স্ট্র্যাপ আসনকে সহজ ও নিরাপদ করে।
- স্থিরভাবে শ্বাস নিন। শ্বাস আটকে রাখছেন মনে হলে একটু শিথিল হোন।
- আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন যদি আপনি গর্ভবতী হন, উচ্চ রক্তচাপ, গ্লুকোমা, অস্টিওপোরোসিস, সাম্প্রতিক চোট বা অস্ত্রোপচার, অথবা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে।
নতুনরা যে সাধারণ ভুলগুলো করেন
ভুল: নমনীয় হতেই হবে বলে ভাবা। নমনীয়তা যোগব্যায়ামের ফল, শর্ত নয়।
ভুল: অন্যদের সঙ্গে নিজের তুলনা করা। প্রত্যেকের শরীর আলাদা। আসনটি দেখতে কেমন তা নয়, অনুভব কেমন হচ্ছে তাতে মনোযোগ দিন।
ভুল: জয়েন্ট লক করে রাখা। হাঁটু ও কনুই রক্ষা করতে সেগুলো সামান্য ভাঁজ রাখুন।
ভুল: শেষের শিথিলায়ন বাদ দেওয়া। শবাসন শরীর ও মনকে অনুশীলনটা আত্মস্থ করতে সাহায্য করে। এটি যোগব্যায়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভুল: অ্যাডভান্সড ক্লাস দিয়ে শুরু করা। "বিগিনার," "জেন্টল" বা "হঠ যোগ" লেখা ক্লাস দিয়ে শুরু করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
নতুনদের কত ঘন ঘন যোগব্যায়াম করা উচিত?
সপ্তাহে দুই-তিনবার ভালো শুরু। এমনকি ১০ থেকে ১৫ মিনিটও উপকারী। অভ্যস্ত হয়ে গেলে আরও ঘন ঘন বা আরও বেশিক্ষণ অনুশীলন করতে পারেন।
ঘরে বসে কি যোগব্যায়াম শেখা যায়?
হ্যাঁ, অনেকেই ভিডিও বা অ্যাপ ব্যবহার করেন। তবে নিরাপদ ভঙ্গি শিখতে প্রথমে একজন যোগ্য প্রশিক্ষকের কাছে কয়েকটি ক্লাস করে নেওয়া ভালো। এতে চোটের ঝুঁকি কমে।
যোগব্যায়াম করে কি ওজন কমানো যায়?
দ্রুত কার্ডিওর চেয়ে যোগব্যায়ামে কম ক্যালোরি পোড়ে, তবে শক্তি বাড়িয়ে, মানসিক চাপ কমিয়ে এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে উৎসাহ দিয়ে এটি ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। ওজন কমাতে চাইলে এর সঙ্গে নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবার মেলান।
কোমর ব্যথায় কি যোগব্যায়াম ভালো?
গবেষণা বলছে, যোগব্যায়াম কোমরের নিচের অংশের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। কোমল ধরন বেছে নিন এবং যে গভীর মোচড় বা বাঁকে ব্যথা লাগে তা এড়িয়ে চলুন। তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী পিঠে ব্যথা থাকলে আগে ডাক্তার দেখান।
যোগব্যায়ামের আগে কী খাওয়া উচিত?
অনুশীলনের দুই-তিন ঘণ্টা আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন। খিদে পেলে প্রায় এক ঘণ্টা আগে হালকা কিছু খান, যেমন একটি কলা বা এক মুঠো বাদাম।